ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জে ফেনসিডিল-ইয়াবার ব্যবসা জমজমাট

 শেখ মোহাম্মদ রতন, সমকালীন মুন্সীগঞ্জ, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১:

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নদীবেষ্টিত জেলা মুন্সীগঞ্জ ফেনসিডিল-গাজা-ইয়াবার মতো মরণ নেশার হাটে পরিনত হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জর দুই পৌরসভার নির্বাচন শেষে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মাদক কারবারিরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশ-প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালী মূল গডফাদাররা অর্থদিয়ে মাদকদ্রব্য কিনে এনে সাধারণ অভাবি শ্রেনীর বখাটে ছেলে-বৃদ্ধদের ও কম বয়সী মেয়েদের দিয়েও বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে বেড়াচ্ছে।

আর মূল গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। সদর থানা ও ডিবি পুলিশ কিছু চুনোপুটি মাদক কারবাড়িদের গ্রেপ্তার করলেও মুল হোতাদের গ্রেপ্তার করছে না।

এই জেলার অধিকাংশ এলাকা এখন ফেনসিডিলসহ যৌন উত্তেজক নেশার ট্যাবলেট ইয়াবার ছোবলে চরমভাবে আক্রান্ত হচ্ছে । স্কুল পড়ুয়া শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্করাও এই নেশার জালে জড়িয়ে গেছে। যা থামানো এখন দুঃস্বাধ্য হয়ে পরেছে।

নেশার কথিত রঙিন উন্মাদনায় কঠিন বিপর্যয়ের সম্মুখীন এখন বর্তমান যুবসমাজ। এমন এক অবস্থায় চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন অভিভাবকসহ জেলাশহর ও শহরতলির সচেতন মানুষেরা।

এসব কিছুই করছে ডিবি পুলিশ ও সদর থানার পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এখন মাদক ব্যবসায়ীরা বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে বলে জেলার একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাদের অভিযোগ রয়েছে ।

সম্প্রতি সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার দুই পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের শহর-শহরতলির বিভিন্ন এলাকার একাধিক মাদকের স্পট ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেল পৌরসভার নির্বাচনে ও আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকন্ঠ পঞ্চসার ইউনিয়নের মিরেশ্বরাইয়ের আমির হোসেন ওরফে ফেনু আমির, নয়াগাও পুর্বপাড়ার বাদশা ওরফে সাইকেল বাদশা, বাস্তহারা এলাকার লিটন, জাহাঙ্গীর আলম, মহাখালী ইউনিয়নের সাতানিখিল এলাকার দুই ভাই শুভ ও কালা বাবু, শহরের মানিকপুরের শহিদ, সদ্য ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জামিনে মুক্তি পাওয়া শহীদ, নয়াগাওয়ের মামুন, চরমুক্তারপুরের পিয়ার আলী (মাদক মামলায় পলাতক আসামি) গনপাড়ার সাইফুল ইসলাম (ডিবি পুলিশের সোর্স)।

তারা সবাই স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সদর থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এবং তাদের ছত্রছায়ায় ফেন্সীডিল-ইয়াবা ও গাজাঁর মতো মরন নেসা এসব মাদক দ্রব্য প্রকাশ্যে  বিক্রি করে বেরাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার অভিযোগ । নয়াগাওয়ের মাদক ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। ফলে উঠতি বয়সের ছেলেরা স্কুল কলেজ ফাঁকি দিয়ে এখন মাদক ব্যবসা ও সেবনে লিপ্ত হয়ে উঠেছে। এতে ধ্বংসের মুখে পরেছে সাধারণ পরিবারগুলো।

শুধু পঞ্চসারই নয় জেলা শহরের কোটঁগাও, কলেজপট্টি,  নয়াগাঁও, গনকপাড়া, নয়াগাঁও পূর্বপাড়া, বাগমামুদালী পাড়া, উত্তর ইসলামপুর, খালইষ্ট, দক্ষিন ইসলামপুর, মুন্সীরহাট, সিপাহিপাড়া, হাতিমাড়া, বেতকা, চর-মুক্তারপুরসহ প্রায় সব এলাকাতেই বর্তমানে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ডিবি পুলিশ ও থানা-পুলিশ নামে মাত্র কঠোর অভিযান চালিয়ে চুনোপুটি মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করছে। পুলিশ প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ না থাকার কারনে মাদক বিক্রেতার গড-ফাদাররা পুলিশ ও স্থানীয়দের ম্যানেজ করে তাদের ছায়াতলে থেকে কুচরা বিক্রেতারা এখন প্রকাশ্য দিবালোকে ফেন্সিডিল ও ইয়াবা বিক্রি করে বেড়াচ্ছে।

জেলার ডিবি ও থানা-পুলিশের হাতে মাদকদ্রব্যসহ অনেক মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করা হলেও আসামিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমানের টাকার বিনিময়ে পুলিশের মনগড়া এজাহার ও চার্জসিট আদালতে পেশ করে তথ্য প্রমান গোপন রাখার কারণে গ্রেফতারকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা জেল থেকে বেড়িয়ে এসে অনায়াসে সেই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশকে মাশোযারার টাকা দিয়ে প্রকাশ্যে শহরের অলিকে-গলিতে বীরদর্পে মাদক নামের মরন নেশা বিক্রি করে যাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাদের অভিযোগ।

একাধীক গোয়েন্দা সংস্থার সু্ত্রে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জের শির্ষ মাদক ব্যবসায়ী বাবা আরিফ, শাহজালাল মিজি, মকবুলসহ শীর্ষ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসী প্রায় ১০ জনের বেশি মাদক কারবারি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও দ্বিতীয় সারির মাদক ব্যবসায়ীরা এখন সরগরম করে তুলেছে ইয়াবা-ফেনসিডিলের ব্যবসাকে।

জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহীনির গোয়েন্দা সংস্থার একাধীক কর্মকর্তারা এসব ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, মুন্সীগঞ্জের বেশিরভাগ উপার্জনক্ষম পুরুষরা বিদেশে এবং ব্যবসা করে থাকেন। ফলে শক্ত অভিভাবক না থাকায় ওইসব পরিবারের সন্তানরা বেপরোয়া চলাফেরা করে এসব মরননেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে একপর্যায়ে তারা মাদকসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পরেছে।

গোয়েন্দাদের অনুসন্ধান সুত্রে আরো জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জে এমন অনেকটি মাদক স্পটের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে নিয়মিতভাবে প্রকাশ্যেই ইয়াবাসহ নানা মাদক কেনাবেচা হয়। মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ও ডিবি পুলিশের বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রতিদিন ও মাসোয়ারা মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ শহরের বাগমামুদালী পাড়া মানিকপুর, নয়াগাঁও ও চরমুক্তারপুর থেকে গত বেশ কয়েকদিন যাবতই সকাল থেকে বিকাল গড়িয়ে সন্ধার পরেও গিয়ে দেখা যায়, ছোট-বড় দালানবাড়ি, অটো-রিকশার গ্যারেজ ও বিদেশ লোক পাঠানো দালাল ও মাদক সেবি-বিক্রেতাদের সাথে জেলার ডিবি পুলিশ ও সদর থানার পুলিশের সদস্যরা খোস-গল্পে মজে থেকে এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে বেড়াচ্ছে । তাদের আসে পাশেই অবস্থান করছিল ১০ থেকে ১২ জন মাদক বিক্রেতা তরুণরা। হাতে তাদের ইয়াবা ও ফেনসিডিল। একটু পর পর সেখানে আনাগোনা বাড়ছিল। আবার মোটরসাইকেল বা হেঁটে অনেককে সেখানে যাওয়া-আসা করতেও দেখা যায়। কেউ ঝোপের আড়ালে কেউবা প্রকাশ্যেই সেখানে মাদকের পসরা বসায় প্রতিদিন।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই মাদক বিক্রেতা বলেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার নয়াগাঁও, সাতানিখিল, চরমুক্তারপুরে সবচেয়ে বেশি পরিচিত মাদকের স্পট থাকলেও পুলিশি তৎপরতায় অনেকে এখন গাঁ ঢাকা দিয়ে মুঠোফোনে প্রকাশ্যে এসব মাদক বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ দিনের বেলায় মাদক বিক্রির পাশাপাশি লোক দেখানোর জন্য অন্যান্য ব্যবসা বানিজ্য ও দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

বর্তমানে এ এলাকায় সদর থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের অভিযান তৎপরতায় মাদকবিক্রি অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে উল্লেখিত নামের মাদক ব্যবসায়ীরা এই এলাকা ছেড়ে এখন ছড়িয়ে পরেছে জেলার আসে-পাশের এলাকায়। সেখানে গিয়েও দিব্বি মাদক বিক্রি করে বেড়াচ্ছে।

তবে বর্তমানে ভিন্ন কৌশলে মাদক পাচার করা হচ্ছে যেমন- সিলেট থেকে পাথরের গাড়ির ভিতরে, এ্যাম্বুলেন্সে করে, নদীপথে বালবোঝাই বাল্কহেডের ভিতরে করে, সিমেন্ট কারখানার জাহাজের মধ্যে সু-কৌশলে বড়-বড় চালান মুন্সীগঞ্জে প্রবেশ করিয়ে বাবা (ইয়াবা) ও ফেনু (ফেনসিডিল) পাচার বেশি হচ্ছে। ইয়াবা ও ফেন্সিডিল কেনাবেচা সহজ ও নিরাপদ হওয়ায় এই দুইটা মাদকদ্রব্য জেলার সর্বত্র বেশি চলে। ফেনুর (ফেনসিডিল) দাম বেশি, এক বোতল বিক্রি হয় পনেরো থেকে দুই হাজার টাকায়। এবং ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে ২’শ থকে ৪’শ টাকা।

গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া অনুসন্ধানি তথ্যানুসারে আরো জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জে বর্তমানে শীর্ষ পর্যায়ের মাদক কারবারিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শহরের মানিকপুরের, শহিদ,  স্বপন, জনি,  আসলাম, সেন্টু, মুক্তার, নতুনগাঁও পূর্বপাড়ার জনি, পঞ্চসারের দূর্গাবাড়ির মাসুম, ফরাজীবাড়ি ঘাটের রহমান, উত্তর ইসলামপুরের রাসেল, পঞ্চসার এলাকার মো. রাসেল, আরও অনেকেই এই মরণ নেশা ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ নানা মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি জেল থেকে বের হওয়া এক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা জানা গেছে সম্প্রতি সদর থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের অভিযানে বেশ কয়েকজন মাদক কারবাড়ি মাদকদ্রব্যসহ আটক হলেও জেল থেকে বের হয়েই থানা ও ডিবি পুলিশকে টাকার বিনিময়ে দেন-দরবার করে শরু করেছে ইয়াবা ও ফেন্সীডিল ব্যবসার।

পুলিশকে টাকা না দিলেই বাড়ি থেকে ধরে থানায় বা ডিবি পুলিশের অফিসে নিয়ে গিয়ে ওই মাদক ব্যবসায়ীর কাছে টাকা দাবী করে এবং ক্রসফায়ার ও রিমান্ডে নেবার কথা বলে হাতিয়ে নেয় লক্ষ লক্ষ টাকা। আটককৃত আস্বামীরা টাকার পরিমান বেশি দিলে তাদেরকে কম মাদকদ্রব্য এজাহারে লিপিবদ্ধ করে আদালতে হাজির করে। আর আসামিরা টাকা কম দিলে তাদেরকে বেশি মাদকদ্রব্য দিয়ে মামলা দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।

গোয়েন্দা সংস্থার সুত্র মতে আরো জানা যায়, জেলা শহরের উপকন্ঠ মুক্তারপুর ও চর মুক্তারপর এলাকার শির্ষ মাদক ব্যবসায়ী মাদক মামলার পলাতক আসামি পিয়ার আলীসহ তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের কাছ থেকে চিহ্নিত মাদক স্পটে মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ও জেলা ডিবি পুলিশের একাধিক সদস্য তাকে গ্রেপ্তার না করে পালাক্রমে গোপনে তার কাছ থেকে গিয়ে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকেন। অনেক পুলিশ সদস্যও মাদকব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে মাদক সেবন করে থাকেন বলে গোয়েন্দা সংস্থারা জানান।

মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা সরকারি কলেজের একাধীক শিক্ষকরা বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি মাদকমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা সমাজ গঠনে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার করা হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখানে আসছে মাদকবিরোধী প্রচারণায়, আমরা সে সুযোগ করে দিচ্ছি। শিক্ষকরা আরো বলেন এ ব্যাপারে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সবার সচেতন হতে হবে।

জেলার সচেতন মহল জানান, নদীপথেই মুন্সীগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ইয়াবাসহ ফেন্সিডিলের মাদকের চালান আসছে। মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদী এই শহরের মাঝ দিয়ে গেছে। ফলে অনেক চালানই সহজে নৌরুট ব্যবহার করে মুন্সীগঞ্জে ঢুকতে পারছে। বিশেষ করে চরঝাপটা এলাকা, চরকিশোরগঞ্জ, ইসলামপুর, গজারিয়াঘাট, শাহ সিমেন্টের বিপরিতের ধলেশ্বরী নদী-ঘেষা শহরের উপকন্ঠ নয়াঁগাও সহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় মাদকের রুট ও কারবার সবচেয়ে বেশি।

অন্যদিকে, শিমুলিয়াঘাট-মাওয়া রুটেও ব্যাপক মাদকের চালান আসছে । এখানে পুলিশসহ অন্যরা যানবাহন নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও মাদকের ব্যাপারে সেখানে নজরদারি একেবারেই নেই বললেই চলে।

অভিযোগ রয়েছে এসব মাদক নারায়ণঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জের চর-মুক্তারপুরের মুক্তারপুর সেতুর বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় পুলিশ-প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় মাদক বিক্রেতাদের কাছে এসে হস্তান্তর করা হয়।

মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রতিটি পরিবারের যুবক-যুবতিসহ স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের নেশার ও অস্ত্র কেনার প্রধান স্পট হিসেবে সেই বেঁছে নিয়েছে ঐ মুন্সীরহাটসহ আসে পাশের গ্রামগুলোকে।

মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজের এক প্রভাষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভাবতেই হাসি পায় যে, মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনি প্রচারনার জন্য স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকসহ জনসাধারণকে অঙ্গীকার করেছিলেন নির্বাচিত হলে সবার আগে সম্পুর্ন পৌরসভাকে মাদকমুক্ত করবো।

কিন্তু মাদক মুক্ত করবেতো দুরের কথা মাদকদ্রব্য বিক্রি আরো কয়েকগুন বেড়ে গেছে। এখন আবার আসছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। সেথানেও এর ব্যাতিক্রম কিছুই ঘটবে না। কারণ নজরদারি করতে পুলিশ-প্রশাসনদের টহল ইউনিয়ন পরিষদে দেখাই যায় না।

অথচ নির্বাচন যায়, আবার নির্বাচন আসে। কিন্তু মাদকমুক্ত তো দুরের কথা যেদিন থেকে জন প্রতিনিধি হয়ে চেয়ারে বসে তারা পৌরসভার দ্বায়ীত্বভার গ্রহন করেন সেদিনের পর থেকে যারা পুলিশ-প্রশাসনের ভয়ে মাদক বেচা-কেনা ছেড়ে দেবার কথা। তা না হয়ে উল্টো সেদিন থেকে যেন সেই মাদক বিক্রেতারা নতুন করে প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে দেদারছে বিক্রি করে বেড়াচ্ছে।

সরেজমিনে আরো জানা গেছে মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকন্ঠ পঞ্চসার ইউনিয়নের নয়াগাও, শহরের উপকন্ঠ চর-মুক্তারপুরের সিমেন্ট কারখানা, কোল্ডষ্টোরেজ ও ডকইয়ার্ড এলাকার আসে-পাশে সর্বত্র চলছে মাদক বিকি-কিনি। ঐতিহ্যবাহি মুন্সীরহাট, গুহেতকান্দি, চরাঞ্চলের চরডুমুরিয়া, মোল্লাকান্দি, বাংলাবাজার, শিলইসহ শহর-শহরতলির প্রত্যন্ত অঞ্চল এখন মাদকের আখরায় পরিনত হয়েছে।

চমকপ্রদ খবর এই যে, বর্তমানে মুন্সীগঞ্জে এসব মাদক পাওয়া না গেলে এক ঘন্টার রাস্তা নারায়ণগঞ্জ থেকে বোড়খা পরিহিত অবস্থায় ছোট ছোট মেয়ে ও মহিলাদের দিয়ে অর্ডার করে নিয়ে আসা হয় স্থল ও নৌ-পথে।

এদিকে চর মুক্তারপুর এলাকাবাসীরা জানান, পুলিশ-প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালী মূল গডফাদাররা অর্থদিয়ে মাদকদ্রব্য কিনিয়ে এনে সাধারণ অভাবি শ্রেনীর বখাটে ছেলে-বৃদ্ধদের ও কম বয়সী মেয়েদের দিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে বেড়াচ্ছে। আর মূল গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোয়ার বাইরে।

গোয়েন্দাদের তথ্যমতে মুন্সীগঞ্জে জরিপ করে দেখা গেছে জেলায় ১২ বছর বয়স থেকে বিয়ের পর পর্যন্ত শতকরা ২০ ভাগ স্কুল-কলেজে পরুয়া মেয়েরা ইয়াবা, ফেন্সিডিল, নেশা জাতীয় ট্যাবলেট সেবন করে মাদকআসক্ত হয়ে সমাজে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে পরছে। এতে পরিবারের অভিভবকরা মেয়েদের বাধ্য হয়েই নাকি বাল্য-বিবাহ দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জেলার একাধীক অভিভাবকরা জানান।

আর বাকি ৮০ ভাগ স্কুল-কলেজে ছাত্ররা পরুয়া ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার যুবকরা ফেন্সিডিল, ইয়াবা, পেথিডিন ও নেশা জাতীয় ট্যাবলেট সেবন করা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এতে করে ছেলেরা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডসহ চুরি ছিনতাই রাহাজানি এমনকি মানুষ খুনের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এটা এখন তাদের কাছে অস্বাভাবিক বলে কিছুই নয় বলে জেলার বিভিন্ন অভিভাবকরা অকপটে স্বীকার করেছেন।

মুন্সীগঞ্জ-১ (মুন্সীগঞ্জ সদর-গজারিয়া) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃনাল কান্তি দাস বলেন, জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে কাজ করে চলেছেন। উন্নয়নের মাধ্যমে বদলে দিয়েছেন বাংলাদেশের রূপ। সেই উন্নত করার জন্য বড় প্রয়োজন নতুন প্রজন্ম। আগামী প্রজন্ম যদি মাদকের ছোবলে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে দেশের তাহলে এ দেশ পিছিয়ে পরবে। মাদক থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষার্থে, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এলাকার জনপ্রতিনিধি বা নেতারা যদি এগিয়ে আসে তাহলে কোনোভাবেই মাদক বিস্তার লাভ করতে পারবে না। এ ব্যাপারে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আসুন মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখি, সুন্দর সমাজ গড়ি।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, মাদকের তৎপরতা এখনোও রয়েছে। এ কারণে মাদকবিরোধী অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি মাদকমুক্ত মুন্সীগঞ্জ গড়ার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে জেলায় টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, মুন্সীগঞ্জ নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় নৌরুট দিয়ে মাদকের চালান আসছে বলে খবর শোনা যায়। এ কারণে ইতোমধ্যেই টহলরত পুলিশ ও কোষ্টগার্ডকেও সজাগ থাকতে বলা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে মাদক প্রতিরোধ করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে। এতে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। যদি কোন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর কোন সদস্য এই মরন নেশায় জড়িত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

মুন্সীগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, বর্তমানে জেলা সদরে মাদকের তেমন কোন বিস্তার নেই বললেই চলে। তবে যেসব মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারি রয়েছে তাদের গ্রেফতার করতে পুলিশ প্রতিদিন শহর ও শহরতলির বিভিন্ন অলি-গলিতে সন্দেহভাজনদের তল্লাসি অব্যাহত রেখেছে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ-প্রশাসন সব সময়ই সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। তবে যদি কোন পুলিশ সদস্য মাদক কারবারিদের সাথে সখ্যতা করে টাকা লেনদেন করে। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগিয় মামলাসহ চাকরি থেকে বহিস্কার করা হবে।

মুন্সীগঞ্জ জেলার ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ(ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, মুন্সীগঞ্জে বর্তমানে মাদকই প্রধান সমস্যা হিসেবে রয়েছে। তবে বিগত বছরে বেশ কিছু শীর্ষ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। মাদক বিক্রেতাদের আটক-গ্রেপ্তার থেমে নেই। মাদকের বিষয়ে জেলার ডিবি পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(প্রশাসন ও অপরাধ) মাহফুজ আফজাল বলেন, জেলা শহর সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদকের বিস্তার থাকলেও বর্তমানে পুলিশ প্রশাসনের চৌকসতা-তৎপরতা থাকার কারণে মাদক বিক্রি নেই বললেই চলে। তবে মাদক নির্মুল করতে হলে সবার আগে পরিবারের অভিভাবকদের সোচ্চার হয়ে নিজের সন্তানদের দিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। তাছাড়া আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে যেন মাদক কারবারিরা ও সেবন কারিরা কোন প্রকার মাদক সেবন করেন তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে জেল-হাজতে প্রেরণ করা হবে। আর যদি জেলা সদরসহ যে কোন উপজেলায় নিয়োগকৃত পুলিশ সদস্যরা মাদকদ্রব্যের সাথে জড়িত থাকে তাহলে তাকে বিভাগীয় মামলাসহ চাকরিচ্যুত করা হবে। মাদকের ব্যপারে কাউকে বিন্দু মাত্র ছাড় দেয়া বিগত দিনে হয় নাই, আর হবেও না।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল মোমেন (পিপিএমবার) মাদকের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। এরই মধ্যে পুলিশ-প্রশাসনের টিমের কঠোর অভিযানের ফলে মুন্সীগঞ্জে মাদক ব্যবসা অনেকাংশে কমে আসছে। নিয়মিতভাবে অভিযান চালিয়ে মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। মাদকের প্রশ্নে কাউকেই কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক বিক্রেতাদের কোন প্রকার ছাড় দেবার প্রশ্নই আসে না। এতে যদি কোন পুলিশ সদস্য জড়িত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ পুলিশ জিরো টলারেন্স।

বি:দৃ:-মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদের এটা পর্ব-৪ চোঁখ রাখুন তথ্য দিন আসছে পর্ব-৫